Dark Mode
Image
  • Wednesday, 04 February 2026
ভূমিকম্পের ফসল সেন্টমার্টিন: সাগরের তলদেশ থেকে জেগে ওঠা এক দ্বীপ

ভূমিকম্পের ফসল সেন্টমার্টিন: সাগরের তলদেশ থেকে জেগে ওঠা এক দ্বীপ

নীল জল, সাদা বালু আর শান্ত প্রকৃতির জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ আজ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। অনেকের কাছেই এটি যেন এক টুকরো স্বপ্নের দ্বীপ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক ইতিহাস—এক মহাশক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলেই জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটির।

ভূতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমান সেন্টমার্টিন দ্বীপের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ২৬৩ বছর আগে, ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল। সেদিন ভারত ও মিয়ানমার টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প। গবেষকদের ধারণা, এই ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে প্রায় ৮.৫ বা তারও বেশি ছিল।

ওই ভূমিকম্পের প্রভাব শুধু স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলজুড়ে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়, পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশে ঘটে ব্যাপক ভৌগোলিক পরিবর্তন। ভূতত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘ভূমিকম্পজনিত সহ-উত্থান’—যার ফলে সমুদ্রের নিচে থাকা বিশাল ভূখণ্ড হঠাৎ করে উপরের দিকে উঠে আসে।

এই শক্তিশালী উত্থানের ফলেই সাগরের তলদেশ থেকে জেগে ওঠে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও আশপাশের কয়েকটি ডুবো চর। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই ভূমিকম্পের রাতে দ্বীপটি প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত উপরে উঠে আসে। দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মৃত প্রবালের স্তর এই ঘটনার সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এসব প্রবাল আগে পানির নিচে ছিল, ভূমিকম্পের ফলে হঠাৎ উপরে উঠে এসে তারা মারা যায়।

কার্বন পরীক্ষাসহ আধুনিক ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ১৭৬২ সালের আগে এই অঞ্চলটি স্থায়ী স্থলভাগ ছিল না। অর্থাৎ, সেন্টমার্টিন দ্বীপ কোনো ধীরে গড়ে ওঠা ভূখণ্ড নয়, বরং একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফল।

গবেষকরা আরও জানান, ওই ভূমিকম্প কেবল নতুন একটি দ্বীপের জন্মই দেয়নি, বরং পুরো দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। একইসঙ্গে সৃষ্ট হয়েছিল ভয়াবহ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, যা তৎকালীন উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটায়।

আজকের শান্ত ও মনোরম সেন্টমার্টিন দ্বীপ তাই শুধু পর্যটনের আকর্ষণ নয়, বরং পৃথিবীর প্রাকৃতিক শক্তির এক জীবন্ত সাক্ষী—যেখানে সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে ধ্বংস আর সৃষ্টির যুগল ইতিহাস।

Comment / Reply From

You May Also Like