টাইপ-৫ ডায়াবেটিস: ভুল চিকিৎসায় বাড়তে পারে মৃত্যুঝুঁকি
বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস নিয়ে আলোচনা সাধারণত টাইপ-১ ও টাইপ-২ কেন্দ্রিক হলেও সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে টাইপ-৫ ডায়াবেটিস। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে তৈরি হওয়া এই ডায়াবেটিসকে দীর্ঘদিন অন্য ধরনের ডায়াবেটিস হিসেবে ভুল শনাক্ত করা হয়েছে, ফলে অনেক রোগী সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখনো টাইপ-৫ ডায়াবেটিসকে আলাদা রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, তবে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ২০২৫ সালে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গবেষকদের ধারণা, বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এ ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন।
টাইপ-৫ ডায়াবেটিস কী?
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসকে অনেক গবেষক অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিস বলেও উল্লেখ করেন। ধারণা করা হয়, শৈশবে দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভোগার ফলে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং পরবর্তীতে ইনসুলিন উৎপাদন কমে যায়।
এ ক্ষেত্রে শরীরে কিছু ইনসুলিন তৈরি হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আবার রোগীরা অনেক সময় ইনসুলিনের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল থাকেন, ফলে প্রচলিত চিকিৎসা সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে।
কেন এটি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ-৫ ডায়াবেটিসকে প্রায়ই ভুল করে টাইপ-১ বা টাইপ-২ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এর ফলে রোগীদের এমন চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে, যা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় ইনসুলিন প্রয়োগের কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
টাইপ-৫ ডায়াবেটিসে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
- অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
- কিডনি বিকল হতে পারে।
- স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
- ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
- গুরুতর অবস্থায় অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন হতে পারে।
- অতিরিক্ত ইনসুলিনে প্রাণঘাতী হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দিতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা।
- ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।
- দ্রুত ওজন কমে যাওয়া।
- সারাক্ষণ ক্লান্ত অনুভব করা।
- দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা।
- অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা।
- শরীর কাঁপা বা অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি।
টাইপ-১ ও টাইপ-৫ এর পার্থক্য কোথায়?
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শরীর প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইনসুলিন তৈরি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু টাইপ-৫ ডায়াবেটিসে শরীর কিছু ইনসুলিন তৈরি করলেও তা যথেষ্ট হয় না এবং রোগীরা ইনসুলিনের প্রতি ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন।
এ কারণে টাইপ-১ এর মতো একই চিকিৎসা টাইপ-৫ রোগীদের জন্য সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারে।
কোন অঞ্চলে বেশি দেখা যায়?
গবেষকদের মতে, টাইপ-৫ ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—
- দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
- সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার অঞ্চলে।
- যেসব এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি এখনও বড় স্বাস্থ্য সমস্যা।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় অন্যান্য দেশেও কম ওজনের মানুষের মধ্যে এ ধরনের ডায়াবেটিস বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কেন এখনো বিতর্ক রয়েছে?
ডব্লিউএইচওসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করে, টাইপ-৫ ডায়াবেটিসকে আলাদা রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বর্তমানে এ রোগ শনাক্ত করার নির্দিষ্ট কোনো ল্যাব টেস্ট বা বায়োমার্কারও নেই। ফলে চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক অবস্থা, অপুষ্টির ইতিহাস এবং ইনসুলিনের প্রতি প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন।
রোগ নির্ণয়ে কী দেখেন চিকিৎসকেরা?
- শৈশবে অপুষ্টির ইতিহাস।
- দীর্ঘদিন কম ওজন থাকা।
- ইনসুলিনে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
- উচ্চ রক্তশর্করার সঙ্গে খুব কম শরীরের ওজন।
- প্রচলিত ডায়াবেটিস চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া।
গবেষকদের নতুন আশা
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন ইতোমধ্যে টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের জন্য পৃথক রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড ও চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে।
প্রাথমিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অনেক রোগী উন্নত পুষ্টি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সতর্কভাবে নির্বাচন করা ওষুধের মাধ্যমে ভালো সাড়া দিতে পারেন।
শেষ কথা
টাইপ-৫ ডায়াবেটিস নিয়ে এখনো গবেষণা চলমান। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টিতে ভোগা কম ওজনের রোগীদের ডায়াবেটিসকে সবসময় প্রচলিত টাইপ-১ বা টাইপ-২ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ ভুল রোগ নির্ণয় শুধু চিকিৎসাকে জটিলই করে না, কিছু ক্ষেত্রে তা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!