তলহীন নীল রহস্য: বঙ্গোপসাগরের ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’
বঙ্গোপসাগরের বুকে এমন একটি স্থান আছে, যেখানে হঠাৎ করেই সমুদ্রের তলদেশ যেন হারিয়ে যায়। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই পানির গভীরতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই রহস্যময় সামুদ্রিক গিরিখাদের নাম সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড (Swatch of No Ground – SONG)—অর্থাৎ যার কোনো তল নেই।
স্থানীয় জেলেরা একে ডাকেন ‘নাই বাম’ নামে। কারণ, তারা গভীরতা পরিমাপ করে ‘বাম’ দিয়ে—পাঁচ বাম, দশ বাম, বিশ বাম। কিন্তু এই জায়গার গভীরতার কোনো হিসাব নেই বলেই নাম ‘নাই বাম’। এটি গঙ্গা খাদ নামেও পরিচিত।
ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ও নামকরণের গল্প
লোককথা অনুযায়ী, ১৮৬৩ সালে ‘গ্যাডফ্লাই’ নামের ২১২ টন ওজনের একটি ব্রিটিশ গানবোট ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ধনরত্ন নিয়ে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পথে ভয়াবহ ঝড়ে এই এলাকায় ডুবে যায়। দীর্ঘ অনুসন্ধানেও জাহাজটির কোনো সন্ধান না পেয়ে ব্রিটিশরা এলাকাটির নাম দেয় Swatch of No Ground।
কীভাবে সৃষ্টি হলো এই গিরিখাদ?
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের উৎপত্তি নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও বিজ্ঞানীদের মতে, প্লাইস্টোসিন যুগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কম থাকাকালে গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র নদী সরাসরি বঙ্গোপসাগরে বিপুল পলিমাটি ফেলত। প্রচণ্ড ও এলোমেলো নদীস্রোত সমুদ্রতলের উপরিভাগ ভেঙে সৃষ্টি করে এই বিশাল সামুদ্রিক গিরিখাদ।
বিশ্বের বিরল সামুদ্রিক গিরিখাদগুলোর একটি
সুন্দরবনের দুবলারচরের দক্ষিণে প্রায় ৩০–৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অঞ্চলটি বিশ্বের মাত্র ১১টি অনুরূপ সামুদ্রিক গিরিখাদের একটি।
আয়তন: প্রায় ১,৭৩৮ বর্গ কিলোমিটার
প্রস্থ: ৫–৭ কিলোমিটার
গভীরতা: কিছু স্থানে প্রায় ১,২০০ মিটার
মেঝে তুলনামূলকভাবে সমতল
ডলফিনের স্বর্গ ও সামুদ্রিক অভয়ারণ্য
বিজ্ঞানীরা সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডকে একটি প্রাকৃতিক সামুদ্রিক অভয়ারণ্য হিসেবে বিবেচনা করেন। বঙ্গোপসাগরের অন্যতম সমৃদ্ধ মৎস্যভাণ্ডার এই অঞ্চলে মাছের পাশাপাশি রয়েছে—
তিমি
ডলফিন
হাঙর
কচ্ছপ
নানা বিরল সামুদ্রিক প্রাণী
বিশেষ করে এখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইরাবতী ডলফিনের প্রজনন এলাকা। পাশাপাশি দেখা যায় ইন্দো-প্যাসিফিক ডলফিন ও পাখনাহীন ইমপ্লাইস ডলফিন। পৃথিবীর একমাত্র স্থান যেখানে এই তিনটি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী একসঙ্গে দেখা যায়। তাই একে বলা হয় “ডলফিনের গ্লোবাল হটস্পট” বা ডলফিনের স্বর্গ।
গবেষণা ও সংরক্ষণ
অতীতে এই অঞ্চলে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। বর্তমানে ‘ইসাবেলা’ নামের একটি সংস্থা সীমিত পরিসরে গবেষণা শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিস্তীর্ণ জলরাশি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই অনন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডকে বাংলাদেশের প্রথম মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া (Marine Protected Area) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!