হারাম উপার্জন কেন ঈমান ও আমলের পবিত্রতা নষ্ট করে?
মানুষ সাধারণত পাপ বলতে বোঝে হাতের জুলুম, জিহ্বার মিথ্যা বা চোখের নিষিদ্ধ দৃষ্টিকে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টি আরও গভীর ও ব্যাপক। রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের দেহের যে অংশটিকে প্রথম দুর্গন্ধময় হবে বলে সতর্ক করেছেন, তা হাত বা চোখ নয়—বরং পেট। এই ঘোষণার মধ্যেই নিহিত আছে ইসলামের গভীর নৈতিক শিক্ষা, যা ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
‘মানুষের দেহের যে অংশ প্রথম দুর্গন্ধময় হবে, তা হলো তার পেট। সুতরাং যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে, সে যেন কেবল পবিত্র (হালাল) খাদ্যই গ্রহণ করে।’ (বুখারি: ৭১৫২)
এই হাদিস শুধু খাদ্যাভ্যাসের নির্দেশনা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। কারণ পেট হলো মানুষের লালসা, প্রবৃত্তি ও লোভের প্রধান প্রবেশদ্বার। মানুষ যখন হালাল-হারামের সীমা ভেঙে ফেলে, তখন তার ইবাদত, দোয়া ও চরিত্র ধীরে ধীরে কলুষিত হয়ে যায়।
ইসলাম খাদ্যকে কেবল শারীরিক প্রয়োজন হিসেবে দেখেনি; বরং একে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকেই আহার করো।’ (সুরা বাকারা: ১৬৮)
এখানে ‘হালাল’-এর পাশাপাশি ‘তাইয়্যিব’—অর্থাৎ পবিত্র ও কল্যাণকর—শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ, খাদ্য শুধু বৈধ হলেই যথেষ্ট নয়; তা হতে হবে অন্যায়, জুলুম ও হারাম উপার্জনমুক্ত।
হারাম খাদ্যের ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফর করে ধূলিধূসরিত অবস্থায় দুহাত তুলে দোয়া করে, ‘হে আমার রব!’ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম। তখন রাসুল (সা.) বলেন, এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয়—হারাম উপার্জনে গঠিত পেট বান্দা ও আল্লাহর মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দেয়। দোয়া কবুল হয় না, ইবাদতে স্বাদ থাকে না, হৃদয় হয়ে ওঠে কঠিন ও উদাসীন।
আজকের সমাজে দুর্নীতি, সুদ, ভেজাল, মুনাফাখোরি ও অনৈতিক উপার্জনের মূল কারণ এই পেটকেন্দ্রিক লোভ। মানুষ আর প্রশ্ন করে না—এই খাবার বা অর্থের পেছনে কার অধিকার নষ্ট হলো, কার চোখের পানি ঝরল। অথচ মহানবী (সা.) সেই পেটকেই প্রথম দুর্গন্ধময় হওয়ার কথা বলেছেন, যাকে মানুষ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এই শিক্ষা আমাদের জানায়, তাকওয়া শুধু নামাজ বা ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাজারে, অফিসে, ব্যবসায় ও উপার্জনের প্রতিটি ধাপে তার বাস্তব প্রয়োগ থাকতে হবে। হালাল খাদ্য গ্রহণ মানে শুধু নিজের শরীরকে রক্ষা করা নয়; বরং ঈমান, পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখা।
শেষ কথা হলো—ইসলামের দৃষ্টিতে পেট কোনো সাধারণ অঙ্গ নয়; এটি মানুষের নৈতিক মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু। যে ব্যক্তি তার পেটকে হালালের মধ্যে সংযত রাখতে পারে, আল্লাহ তার জন্য কল্যাণ ও জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর যে এখানে শিথিলতা দেখায়, তার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে দেহে, আমলে ও পরিণতিতে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!