পুরুষদের ফুসফুসের ক্যানসার বেশি হয় কেন? জানুন বিজ্ঞান যা বলছে
বিশ্বজুড়ে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ফুসফুসের ক্যানসার। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার এবং মৃত্যুঝুঁকি দুটিই বেশি। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ধূমপানের উচ্চ হারকে দায়ী করা হলেও বায়ুদূষণ, ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ নতুন করে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ১৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এই রোগে। বাংলাদেশেও ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ শতাংশই ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছেন।
ফুসফুসের ক্যানসার কী?
ফুসফুসের টিস্যুর কোষগুলো যখন অস্বাভাবিকভাবে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখন টিউমার তৈরি হয়। এই অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধিকেই ফুসফুসের ক্যানসার বলা হয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পুরুষদের ঝুঁকি বেশি কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তাদের ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।
এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে—
- সিগারেট, বিড়ি বা অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্য সেবন
- পরোক্ষ ধূমপানের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা
- বায়ুদূষণ ও শিল্পকারখানার ক্ষতিকর ধোঁয়া
- রেডন গ্যাস ও অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ
- পারিবারিক বা বংশগত ঝুঁকি
ফুসফুসের ক্যানসারের সাধারণ লক্ষণ
রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো উপসর্গই দেখা যায় না। তবে ক্যানসার অগ্রসর হলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে—
- দীর্ঘদিন ধরে কাশি থাকা বা কাশি বেড়ে যাওয়া
- কাশির সঙ্গে রক্ত বা কফ বের হওয়া
- শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ
- বুক, পিঠ বা কাঁধে ব্যথা
- বারবার নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হওয়া
- অকারণে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
ফুসফুসের ক্যানসারের ধরন
ফুসফুসের ক্যানসার সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে।
নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার (NSCLC):
প্রায় ৮৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এই ধরনের ক্যানসার দেখা যায়। এটি তুলনামূলক ধীরে বৃদ্ধি পায়।
স্মল সেল লাং ক্যানসার (SCLC):
এই ক্যানসার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণত দীর্ঘদিনের ধূমপায়ীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
কীভাবে রোগ শনাক্ত করা হয়?
ফুসফুসের ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করে থাকেন। যেমন—
- কফ পরীক্ষা
- বুকের এক্স-রে
- সিটি স্ক্যান
- পিইটি (PET) স্ক্যান
- ব্রঙ্কোস্কপি
- বায়োপসি
- টিউমার মার্কারসহ প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা
চিকিৎসার উপায়
রোগের ধরন ও পর্যায়ের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো—
- রেডিওথেরাপি: উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিকিরণের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা।
- কেমোথেরাপি: বিশেষ ওষুধের সাহায্যে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা।
- টার্গেটেড থেরাপি: নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দেওয়া।
- ইমিউনোথেরাপি (জৈবিক চিকিৎসা): শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে সক্রিয় করে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করা।
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধে কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—
- ধূমপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করুন।
- পরোক্ষ ধূমপানের ধোঁয়া থেকেও দূরে থাকুন।
- বায়ুদূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
- পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
- দীর্ঘদিন কাশি বা সন্দেহজনক উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত স্ক্রিনিং করান।
শেষ কথা
ফুসফুসের ক্যানসার একটি গুরুতর হলেও অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে ধূমপানই এই ক্যানসারের প্রধান কারণ। তাই ধূমপান ত্যাগ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!