প্রাচীন মিশরের রহস্যময় ধর্মবিশ্বাস
প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। তবে প্রাচীন যুগের মানুষের ধর্মচর্চা ও বিশ্বাস বর্তমান সময়ের মানুষের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই বিস্ময়কর মনে হয়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই দেখা যায়, প্রাচীন মিশর ছিল এমন এক সভ্যতা—যেখানে ধর্ম, দেবতা ও মৃত্যুর ধারণা ছিল অত্যন্ত জটিল এবং রহস্যময়।
প্রাচীন মিশর ছিল একসময় পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সভ্যতা। পিরামিড, মমি ও অসংখ্য দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে তারা ইতিহাসে নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে। আজও মিশরের জাদুঘরগুলোতে সংরক্ষিত মমিগুলো সেই প্রাচীন বিশ্বাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দেবতা ও ধর্মীয় বিশ্বাস
প্রাচীন মিশরের ধর্মে বহু দেব-দেবীর অস্তিত্ব ছিল। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য তারা আলাদা দেবতার পূজা করত। সূর্যদেবতা ‘রা’ বা ‘রি’ ছিলেন তাদের প্রধান দেবতা। রা-কে সাধারণত মানুষের দেহে বাজপাখির মাথা ও সাপজড়ানো সূর্যচক্রের মুকুটসহ কল্পনা করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নাম আমন, আটনসহ বিভিন্ন রূপে পরিবর্তিত হয়েছে।
মিশরীয় ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে ছিল এক বিশাল জলরাশি। সেই জল থেকে একটি পদ্মফুলের জন্ম হয় এবং সেখান থেকেই সূর্যদেবতার আবির্ভাব। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সেব ছিলেন পৃথিবীর দেবতা, নুট আকাশের দেবী, আর শু ও টেফনুট বায়ুমণ্ডলের প্রতীক।
সেবের সন্তানদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ওসাইরিস ও সেট। ওসাইরিস ছিলেন শুভ ও ন্যায়পরায়ণ দেবতা, আর সেট পরিচিত ছিল অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে। ঈর্ষা ও ক্ষমতার লড়াইয়ে সেট ওসাইরিসকে হত্যা করে। পরে দেবী আইসিস ও শেয়ালমুখো দেবতা আনুবিসের সহায়তায় ওসাইরিসকে পুনর্জীবিত করা হলেও তিনি আর জীবিত জগতে ফিরে আসেননি; বরং মৃত্যুর পরের জগতের শাসক হিসেবে থেকে যান।
হোরাস ও রাজত্বের বৈধতা
আইসিস ও ওসাইরিসের পুত্র হোরাসও ছিলেন সূর্যদেবতার এক রূপ, তাঁর মাথাও ছিল বাজপাখির মতো। বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে হোরাস রাজা হন। তবে সেট দাবি তোলে—মৃত ওসাইরিসের সন্তান রাজা হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত জ্ঞানের দেবতা থথ প্রমাণ করেন, হোরাসই ওসাইরিসের বৈধ সন্তান। ফলে হোরাসের রাজত্ব স্বীকৃতি পায়।
মমি ও মৃত্যুর পরের জীবন
প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল—মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু একদিন তা আবার দেহে ফিরে আসতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই মৃতদেহ সংরক্ষণের বিশেষ পদ্ধতি চালু হয়, যা আজ ‘মমি’ নামে পরিচিত।
মমি তৈরির সময় দেহের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বের করে বিশেষ মসলা ও রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে দেহ সংরক্ষণ করা হতো, যাতে তা পচে না যায়। মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও কবরস্থ করা হতো, যেন পরজীবনে সে সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। তবে এই সম্মান সাধারণত রাজা ও ধনীদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল।
প্রকৃতির পূজা
মিশরীয়রা নীল নদকেও দেবতার মর্যাদা দিত, কারণ এই নদীই তাদের কৃষি ও সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ছিল। এমনকি মরুভূমির শুকনো বাতাসকেও তারা দেবতার রূপে কল্পনা করত।
আজ সেই প্রাচীন ধর্ম বিলুপ্ত হলেও, মিশরের ইতিহাস, দেবতা ও বিশ্বাস আজও মানুষকে বিস্মিত করে। হাজার হাজার বছর পরেও প্রাচীন মিশরের ধর্মীয় দর্শন সভ্যতার বিকাশে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!