৮ কোটি মানুষের দেশ, আয় ১২ ট্রিলিয়ন ডলার: ইরানের অর্থনৈতিক শক্তির ভেতরের গল্প
মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে অবস্থিত ইরান শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিশ্বে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। প্রায় ১৬ লাখ ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটির রাজধানী তেহরান। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ, যা বর্তমানে ৮ কোটির কাছাকাছি। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ৪৮ জন।
ধর্ম, শিক্ষা ও জীবনমান
ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ শিয়া মুসলমান, ৪ শতাংশ সুন্নি এবং বাকি অংশ খ্রিস্টান, ইহুদি, জরথুস্ট্র ও বাহাই সম্প্রদায়ের মানুষ। দেশটির শিক্ষার হার ৯৫ শতাংশের বেশি, যা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। মাথাপিছু আয় সরকারি হিসাবে প্রায় ১২,৮৩৩ মার্কিন ডলার, যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে তা ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ধরা হয়। এ কারণে ইরানকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশাল ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক গঠন
আয়তনের দিক থেকে ইরান বিশ্বে ১৮তম বৃহৎ দেশ। এর আয়তন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেন—এই চারটি দেশের মোট আয়তনের সমান। ককেসাস, জাগ্রোস ও আলবুর্জ পর্বতমালা ঘিরে রেখেছে পুরো দেশটিকে, যা ইরানকে বিশ্বের অন্যতম পাহাড়বেষ্টিত দেশে পরিণত করেছে।
জিডিপি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
২০১৭ সালে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল প্রায় ১,৬৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে দেশটি বিশ্বের ১৮তম বৃহৎ অর্থনীতির তালিকায় স্থান পায়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২১ সালে ইরানের জিডিপি বেড়ে প্রায় ২,০৯৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা ছিল, যা সৌদি আরব, স্পেন ও কানাডার অর্থনীতিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি জানিয়েছিলেন, বার্ষিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি খাতে অন্তত ৫০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি তেল ও গ্যাস খাতে আরও প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
এনার্জি সুপারপাওয়ার ইরান
ইরানকে বলা হয় ‘এনার্জি সুপারপাওয়ার’। বিশ্বের মোট গ্যাস মজুদের প্রায় ১৫ শতাংশ রয়েছে এই দেশের হাতে, যা রাশিয়ার চেয়েও বেশি। তেল মজুদের দিক থেকে ইরানের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ; বৈশ্বিক তেল সম্পদের প্রায় ১০ শতাংশই ইরানে রয়েছে। বর্তমানে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮০ হাজার মেগাওয়াট, যা দিয়ে বিশ্বে ১৪তম স্থানে অবস্থান করছে ইরান। ২০২৫ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ খাত থেকেই ৩০ বিলিয়ন ডলার আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি।
প্রযুক্তি ও পরমাণু সক্ষমতা
২০০৯ সালে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘সাফির’ রকেট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম হয় ইরান। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র সাতটি দেশের মতো ইরানও নিজস্ব প্রযুক্তিতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সক্ষম। পাশাপাশি পূর্ণ পরমাণু জ্বালানি চক্র নিয়ন্ত্রণে সক্ষম এলিট দেশগুলোর তালিকায়ও রয়েছে তারা।
বিশাল বাজার ও আইটি সম্ভাবনা
৮ কোটি মানুষের এই দেশটিকে বিশ্বের ১৭তম বৃহৎ ভোক্তা বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ইরানের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কম্পিউটার, গেমিং ডিভাইস ও মোবাইল ফোনের বাজার কয়েক বছরের ব্যবধানে ৯.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, ইরান কমলা, মাল্টা ও লেবুজাতীয় ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি। শসা, খেজুর, ডুমুর, পেস্তা, আখরোট ও তরমুজ উৎপাদনেও ইরান শীর্ষস্থানীয়। দেশটি রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য ও সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানি করছে। উটপাখির মাংস উৎপাদনে ইরান বিশ্বে দ্বিতীয়।
অটোমোবাইল ও নগরায়ন
কার উৎপাদনে ইরান বর্তমানে বিশ্বে ১৬তম স্থানে রয়েছে। ২০১৭ সালে দেশটি প্রায় ১৫ লাখের বেশি গাড়ি উৎপাদন করে। নগরায়নের ক্ষেত্রেও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে ইরান—১৯৫০ সালে যেখানে মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করত, সেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৮০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা জাতিসংঘের।
পর্যটনে বৈচিত্র্য
পারস্য উপসাগরের কিশ দ্বীপসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থানে প্রতিবছর ৭০ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন। ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, ইরান বিশ্বের শীর্ষ ১০ পর্যটন সম্ভাবনাময় দেশের একটি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ইরান বিশ্বের ১৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে—যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!