রোজায় ক্ষুধা–তৃষ্ণা কমাতে পুষ্টিবিদের কার্যকর কৌশল
রমজান মাসে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। দীর্ঘ সময় উপবাস থাকার ফলে অনেকেই ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি কিংবা অবসাদ অনুভব করেন। বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ বা রক্তে শর্করার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য বিষয়টি আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। স্বাস্থ্যকর উপায়ে রোজা রাখতে পুষ্টিবিদরা কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন, যা অনুসরণ করলে সারাদিন সতেজ থাকা সহজ হতে পারে।
বিভিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে BBC একটি প্রতিবেদনে রোজায় সুস্থ থাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে।
সেহরি: তিন ধাপে সঠিক প্রস্তুতি
দিনের প্রথম খাবার সেহরি। এই সময়ের খাবারই নির্ধারণ করে সারাদিনের শক্তি ও পানির ভারসাম্য।
পুষ্টিবিদ ফাদি আব্বাসের মতে, সেহরির খাবারে এমন উপাদান রাখা উচিত, যাতে প্রায় ৭০ শতাংশ পানির উপস্থিতি থাকে। তিনি সেহরি তিন ধাপে খাওয়ার পরামর্শ দেন, প্রতিটি ধাপের মধ্যে অন্তত পাঁচ মিনিট বিরতি রেখে।
প্রথম ধাপ:
সালাদ দিয়ে শুরু করুন। শসা, লেটুসসহ পানিসমৃদ্ধ সবজি রাখতে পারেন। তবে লবণ কম ব্যবহার করা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত লবণ পরে তৃষ্ণা বাড়ায়।
দ্বিতীয় ধাপ:
শর্করা ও প্রাকৃতিক চিনি জাতীয় খাবার খান। যেমন তরমুজ, কমলা বা অন্যান্য পানিসমৃদ্ধ ফল। চাইলে এক কাপ তাজা ফলের রসও নিতে পারেন।
তৃতীয় ধাপ:
পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তবে একবারে অতিরিক্ত নয়—পরিমিতভাবে।
ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ (NHS) সেহরিতে চা ও কফি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। কারণ ক্যাফেইন শরীর থেকে দ্রুত পানি বের করে দেয়, ফলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। পানিশূন্যতা হলে মাথাব্যথা, নিম্ন রক্তচাপ কিংবা কিডনির সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
ইফতারে অতিরিক্ত খাবার কেন ক্ষতিকর?
অনেক পরিবারে ইফতারের টেবিলে নানা পদের খাবার থাকে। এতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে পেটব্যথা, ভারী লাগা, ঘুমঘুম ভাব ও অলসতা তৈরি হয়। উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
ফাদি আব্বাসের মতে, রোজার প্রথম কয়েক দিন বেশি কষ্টকর মনে হতে পারে। কারণ শরীর তখনো শক্তির জন্য সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয় না।
ইফতারও তিন ধাপে
সেহরির মতো ইফতারও ধাপে ধাপে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে অন্তত ছয় মিনিট বিরতি রাখা উচিত। কারণ মস্তিষ্কে ‘পেট ভরা’ সংকেত পৌঁছাতে প্রায় ১৮ মিনিট সময় লাগে।
প্রথম ধাপ:
এক কাপ পানি দিয়ে রোজা ভাঙুন। বসে ধীরে পানি পান করুন।
দ্বিতীয় ধাপ (ছয় মিনিট পর):
প্রাকৃতিক চিনি ও শর্করা জাতীয় খাবার—যেমন খেজুর বা ফলের রস—গ্রহণ করুন, যা দ্রুত শক্তি জোগাবে।
তৃতীয় ধাপ (আরও ছয় মিনিট পর):
সালাদ দিয়ে শুরু করে সীমিত পরিমাণে এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট (ভাত, রুটি, আলু, খিচুড়ি ইত্যাদি) এবং এক ধরনের প্রোটিন (ডিম, শস্য, চর্বিহীন মাংস বা দুগ্ধজাত খাবার) গ্রহণ করুন।
খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নরম খাবার অন্তত ৩০ সেকেন্ড এবং শক্ত খাবার এক মিনিট পর্যন্ত চিবিয়ে খেলে হজম সহজ হয়।
পানি পানের সঠিক নিয়ম
একবারে অতিরিক্ত পানি পান করলে অন্ত্র ও কিডনির ওপর চাপ পড়ে। তাই এক ঘণ্টার ব্যবধানে এক–দুই কাপ করে পানি পান করা ভালো। তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নির্দিষ্ট বিরতিতে পানি পান করা উচিত। প্রয়োজনে অ্যালার্ম সেট করেও মনে করিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
সচেতন খাদ্যাভ্যাস, ধাপে ধাপে খাবার গ্রহণ এবং সঠিকভাবে পানি পান—এই কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললে রোজায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনেকটাই কমানো সম্ভব। সুস্থ থাকতে চাই পরিকল্পিত সেহরি ও পরিমিত ইফতার।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!