রোবটিক্স: মানুষের সহযাত্রী, নাকি নীরব চাকরি-দখলদার?
এক সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখা গেল—ঘর পরিষ্কার, নাশতার টেবিলে গরম চা, অফিসের ফাইলগুলো সুন্দরভাবে গুছানো। এসব কাজ করেছে কোনো মানুষ নয়, বরং আপনার ঘরের সহকারী রোবট। একসময় যা কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির অংশ ছিল, আজ রোবটিক্সের দ্রুত অগ্রগতিতে তা বাস্তবতার কাছাকাছি।
শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবন—সবখানেই রোবটিক্সের উপস্থিতি বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই প্রযুক্তি কি আমাদের জীবন সহজ করছে, নাকি ধীরে ধীরে মানুষের কাজের জায়গা দখল করে নিচ্ছে?
রোবট: সহকারী না প্রতিদ্বন্দ্বী?
রোবট মূলত প্রোগ্রামভিত্তিক যন্ত্র, যাদের তৈরি করা হয়েছে নির্দিষ্ট কাজ মানুষের মতো বা মানুষের চেয়েও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার জন্য। গাড়ি তৈরির কারখানা, সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচার, মহাকাশ গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই রোবট এখন নির্ভরযোগ্য সহকারী। তারা ক্লান্ত হয় না, বিরতি চায় না এবং ভুলের হারও তুলনামূলকভাবে কম।
তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন রোবট মানুষের কর্মক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের গুদামগুলোতে যেখানে একসময় শত শত শ্রমিক কাজ করতেন, সেখানে এখন অনেক কাজ করছে স্বয়ংক্রিয় রোবট। বাংলাদেশেও কিছু গার্মেন্টস কারখানায় অটোমেশন চালু হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা বাড়ছে।
রোবটিক্সের সুবিধা: জীবনকে সহজ করার প্রযুক্তি
রোবটিক্স যে মানুষের জীবনকে সহজ করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
চিকিৎসায়, রোবটিক সার্জারি চিকিৎসকদের আরও নিখুঁতভাবে অপারেশন করতে সাহায্য করছে। যেখানে মানুষের হাত পৌঁছানো কঠিন, সেখানে রোবট সহজেই কাজ করতে পারে। ফলে অপারেশনের সময় ও ঝুঁকি দুটোই কমছে।
গৃহস্থালিতে, রোবটিক ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, স্মার্ট কিচেন ডিভাইস বা এআই হোম অ্যাসিস্ট্যান্ট আমাদের দৈনন্দিন ঝামেলা কমিয়ে দিচ্ছে। এতে সময় বাঁচছে, বাড়ছে সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়, ভূমিকম্প বা আগুনের পর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষ খুঁজে বের করতে রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা উদ্ধারকর্মীদের জীবন ঝুঁকি কমাচ্ছে।
শিক্ষায়, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে রোবট সহকারী হিসেবে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়াচ্ছে। রোবট এখানে শিক্ষক নয়, বরং শেখার সহায়ক।
চাকরি হারানোর ভয়: আতঙ্ক নাকি বাস্তবতা?
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকে অটোমেশনের কারণে প্রায় ৮৫ মিলিয়ন চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে একঘেয়ে ও শারীরিক শ্রমনির্ভর কাজগুলো।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগের। গার্মেন্টস, ব্যাংকিং, কুরিয়ার বা রেস্তোরাঁ খাতে অটোমেশন বাড়লে স্বল্পদক্ষ শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ কমে যেতে পারে।
ইতিহাস কী বলে?
ইতিহাস দেখায়, নতুন প্রযুক্তি পুরোনো কিছু কাজ শেষ করলেও নতুন বহু পেশার জন্ম দেয়। কম্পিউটার আসার পর যেমন তৈরি হয়েছিল প্রোগ্রামার, গ্রাফিক ডিজাইনার বা ডেটা সায়েন্টিস্টের মতো পেশা, তেমনি রোবটিক্সও তৈরি করছে নতুন কাজ।
রোবট প্রোগ্রামিং, রোবট মেরামত, ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার সিকিউরিটি কিংবা রোবটিক্স প্রশিক্ষণ—এসব ক্ষেত্র ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে। মূল শর্ত একটাই—মানুষকে দক্ষ হতে হবে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলাতে হবে।
নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন
রোবটিক্স কেবল চাকরির প্রশ্নই নয়, নৈতিকতার বিষয়ও সামনে আনছে। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে দায় কার? যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত রোবট ভুল আক্রমণ করলে দায়ভার কে নেবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রযুক্তির পাশাপাশি আইন ও নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
রোবট ও মানবিক মূল্যবোধ
রোবট কখনও মানুষের অনুভূতি, সহানুভূতি বা নৈতিক বোধের বিকল্প হতে পারে না। বৃদ্ধাশ্রমে রোবট যত্নে সহায়ক হলেও, মানুষের ভালোবাসার জায়গা পূরণ করতে পারে না। এখানেই মানুষের অনন্যতা।
শেষ কথা
রোবটিক্স আমাদের সামনে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। এটি যেমন কাজ সহজ করছে, তেমনি কর্মসংস্থান ও নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছে। তবে রোবটকে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহকর্মী হিসেবে দেখা যায়, তাহলে মানুষ চিন্তা করবে, পরিকল্পনা করবে—আর রোবট কাজ করবে।
মানুষ ও রোবট একসঙ্গে কাজ করলেই সম্ভব প্রযুক্তি ও মানবতার সুন্দর সহাবস্থান। ভবিষ্যতের সমাজে রোবটিক্স মানুষের জীবন সহজ করবে—মানুষের জায়গা দখল করার জন্য নয়, বরং মানুষকে আরও মানবিক করে তোলার জন্য।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!