ডেঙ্গু ভ্যাকসিন: আছে টিকা, তবু কেন বাংলাদেশে নয়?
ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে প্রতিদিন। একসময় বর্ষাকালকে ডেঙ্গুর মৌসুম ধরা হলেও এখন বাস্তবতা ভিন্ন—সারা বছরই ডেঙ্গুর ঝুঁকি রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে অনেকের প্রশ্ন, ডেঙ্গুর কি কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন আছে? থাকলে বাংলাদেশ কেন তা ব্যবহার করছে না?
ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এডিস প্রজাতির মশার বিস্তার বেড়েছে। এর ফলেই ডেঙ্গুজ্বর এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। ভবিষ্যতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই বাস্তবতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একদিকে যেমন এডিস মশার বিস্তার রোধ জরুরি, অন্যদিকে ভ্যাকসিন ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন এখনো সর্বজনীন সমাধান হয়ে উঠতে পারেনি।
ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন আছে, কিন্তু সীমাবদ্ধতা বড়
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর জন্য দুটি ভ্যাকসিন ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। তবে সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, ভ্যাকসিন ব্যবহারের আগে রোগটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এপিডেমিক’ ঘোষণা করতে হয়, যা জনমনে আতঙ্ক বাড়াতে পারে। তিনি মনে করেন, টিকার চেয়ে মানুষের সচেতনতা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর।
বিশ্বে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের অবস্থা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এমনকি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু দেশেও ডেঙ্গুর বিস্তার রয়েছে।
এই বিশাল ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ব্যবহার এখনো সীমিত। বর্তমানে বিশ্বে মূলত দুটি ডেঙ্গু ভ্যাকসিন রয়েছে—
ডেঙ্গাভ্যাক্সিয়া: ফ্রান্সের সানোফি-অ্যাভেন্টিজের তৈরি এই ভ্যাকসিন কিছু দেশে অনুমোদিত। তবে এটি কেবল তাদের জন্য, যাদের আগে একবার ডেঙ্গু হয়েছে। যারা কখনো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি, তাদের জন্য এই ভ্যাকসিন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কিউডেঙ্গা: জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি এই টিকা ২০২৩ সালে ডব্লিউএইচও অনুমোদন দেয়। এটি দুই ডোজের টিকা এবং মূলত ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য অনুমোদিত।
এই দুই টিকার কোনোটিরই ব্যবহার বাংলাদেশে এখনো অনুমোদন পায়নি।
বাংলাদেশে কেন ব্যবহার হচ্ছে না?
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের বয়সসীমা, পূর্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার শর্ত এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকির কারণে এটি সবাইকে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে গণটিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও রোগীর পূর্ণ ইতিহাস জানা সব সময় সম্ভব হয় না, সেখানে ভ্যাকসিন ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ট্রায়াল
যদিও বাংলাদেশে এখনো ডেঙ্গু টিকার অনুমোদন নেই, তবে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) একটি ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের লার্নার কলেজ অব মেডিসিন ও আইসিডিডিআরবি যৌথভাবে এই গবেষণা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) উদ্ভাবিত ওই টিকার নাম ছিল টিভি০০৫।
তবে পরবর্তী ধাপের ট্রায়াল ও বাণিজ্যিক উৎপাদন নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানান অধ্যাপক মোশতাক হোসেন।
ভ্যাকসিনের পাশাপাশি সচেতনতা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া, ফুলের টব বা পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা, মশারি ব্যবহার—এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
অধ্যাপক কবিরুল বাশারের ভাষায়,
“ডেঙ্গু ভ্যাকসিন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের সময় লাগবে। তবে মানুষ সচেতন হলে, শুধু টিকার ওপর নির্ভর না করেও ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।”
সূত্র: বিবিসি
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!