Dark Mode
Image
  • Wednesday, 11 February 2026
মাথা–চোখ–ঘাড় ব্যথা বাড়ছে: ভাইরাস নাকি ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব?

মাথা–চোখ–ঘাড় ব্যথা বাড়ছে: ভাইরাস নাকি ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব?

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে চাপ ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ বেড়েছে। অফিস, বাসা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই শোনা যাচ্ছে একই কথা, “মাথা ফেটে যাচ্ছে”, “চোখের পেছনে অসম্ভব ব্যথা”, “ঘাড় এমন ধরেছে যে নড়াচড়া করা যাচ্ছে না”। অনেকের মনে প্রশ্ন—এটা কি সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর, নাকি নতুন কোনো ভাইরাসের প্রভাব?

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দেবাশিশ রঞ্জন জানান, টানা তিন দিন ধরে তীব্র মাথাব্যথা ও চোখের চারপাশে চাপ অনুভব করছেন তিনি। সঙ্গে ঘাড়ে টান ও অস্বস্তি। রক্তচাপ ও ঘুম স্বাভাবিক থাকলেও ব্যথা কমছে না। বিষয়টি আরও সন্দেহজনক হয়ে ওঠে যখন তার স্ত্রীর মধ্যেও একই উপসর্গ দেখা দেয়।

দেবাশিশের মতো অভিজ্ঞতা এখন অনেকেরই। চিকিৎসকদের চেম্বারে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ একই ধরনের সমস্যা নিয়ে আসছেন।

চিকিৎসকদের কী বলছেন?

নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. জোনায়েদ রহিম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মাথা, ঘাড় ও চোখ ব্যথার রোগী সংখ্যা বেড়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো ভাইরাসজনিত সংক্রমণের উপসর্গ। এবারের একটি লক্ষণীয় দিক হলো—অনেক রোগীর জ্বর তুলনামূলক বেশি, যা কোভিডের শুরুর দিকের উপসর্গের সঙ্গে কিছুটা মিল রাখে।

রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা জ্বর হলে প্যারাসিটামল, অ্যালার্জির ক্ষেত্রে অ্যান্টিহিস্টামিন এবং জ্বর চার-পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হলে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছেন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তারা।

নতুন কোনো ভাইরাস কি?

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোনালিসা বলেন, মাথা, চোখ ও ঘাড় ব্যথা ভাইরাস জ্বরের পরিচিত উপসর্গ। এটি নতুন কিছু নয়। এই সময়টায় বাতাসে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (RSV), ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোভাইরাস ও অ্যাডিনোভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে।

এসব ভাইরাস শ্বাসতন্ত্রে আক্রমণ করে এবং মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, গলা ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া ও জ্বরের মতো উপসর্গ তৈরি করে। তবে ভাইরাসে নতুন কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব

শীত ও বসন্তের সন্ধিক্ষণের এই সময়টাকে চিকিৎসকেরা ‘সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ সময়’ বলে মনে করেন। দিনে গরম, রাতে ঠান্ডা—এই দ্রুত তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে শুষ্ক বাতাস, ধুলো-বালি ও পরাগরেণু অ্যালার্জি ও সাইনাসের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ঠান্ডা ও গরমের এই ওঠানামায় মাথার ভেতরের রক্তনালি বারবার সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়। এতে মাথার ভেতরে চাপ তৈরি হয়, পেশিতে টান পড়ে এবং কপাল, চোখের ওপর বা কানের পাশে ব্যথা অনুভূত হয়। নাক বন্ধ থাকলে বা সাইনাসের নালি বন্ধ হলে এই ব্যথা আরও বেড়ে যায়।

শরীরের ভেতরের কারণও দায়ী

শীতকালে অনেকেই কম পানি পান করেন, ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। ডিহাইড্রেশন মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি ঠান্ডার কারণে ঘাড় ও কাঁধের পেশি শক্ত হয়ে যায়, যা থেকে ব্যথা মাথার দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইরাস সংক্রমণে ঘাড়ের লিম্ফ নোড ফুলে যেতে পারে, এতে ঘাড় শক্ত লাগে ও ব্যথা হয়। শুষ্ক আবহাওয়ায় নাক ও সাইনাস শুকিয়ে গিয়ে চোখের পেছনে চাপ তৈরি হয়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টে ভোগা ব্যক্তিরা এই সময়ে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। যাদের আগে থেকেই মাইগ্রেন বা দীর্ঘমেয়াদি মাথাব্যথার সমস্যা আছে, তাদের কষ্টও এই সময়ে বেড়ে যায়।

সুস্থ থাকতে করণীয়

চিকিৎসকদের মতে, কিছু সাধারণ অভ্যাস মেনে চললেই এই উপসর্গগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব—

ঠান্ডায় মাথা, কান ও কপাল ঢেকে রাখা

পর্যাপ্ত পানি পান করা

ঘাড়ে ব্যথা হলে গরম সেঁক দেওয়া

দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে না থাকা

স্ক্রিন ব্যবহারে বিরতি নেওয়া

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ও হাঁটা

ঘরের বাতাস খুব শুকনো হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার

পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম

হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টায় শরীর একটু বাড়তি যত্ন চায়। ছোট উপসর্গগুলোকে অবহেলা না করে, আবার অকারণ আতঙ্কেও না ভুগে সচেতন থাকাই সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা।

Comment / Reply From