৩২ হাজার কোটির মালিক, তবু কাজেই ডুবে থাকেন লুয়ানা
মাত্র ৩০ বছর বয়সেই আনুমানিক ৩২ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। অথচ বিপুল এই সম্পদের মালিক হওয়ার পরও তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন, ছুটি নেওয়ার প্রবণতাও খুব একটা নেই। বিলাসবহুল জীবনযাপনের চেয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়াই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্রাজিলের উদ্যোক্তা লুয়ানা লোপেস লারা।
প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম কালশির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) লুয়ানার আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার সমান। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, তিনি বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ স্বনির্মিত নারী বিলিয়নিয়ার।
সম্প্রতি ফোরচুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লুয়ানা জানিয়েছেন, এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেও তাঁর জীবনযাপনে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। কালশি গড়ে তোলা ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রতি তাঁর মনোযোগ বরাবরই গভীর। সেই কারণেই আগের মতোই দীর্ঘ সময় কাজ করেন তিনি।
তবে পরিবর্তন যে একেবারেই আসেনি, তা নয়। মাঝেমধ্যে ভালো কোনো রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে বেশি খরচ করেন বলে জানিয়েছেন এই উদ্যোক্তা। তাঁর ভাষায়, কখনো কখনো নিজের জন্য একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাই বিলাসিতার অংশ।
ব্যালে নৃত্য থেকে প্রযুক্তি দুনিয়ায়
প্রযুক্তি খাতে পরিচিতি পাওয়ার আগে লুয়ানা পেশাদার ব্যালেরিনা হওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ব্রাজিলের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই তরুণী পরে প্রযুক্তি ও ব্যবসার জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
সহপ্রতিষ্ঠাতা তারেক মনসুরের সঙ্গে ২০১৮ সালে কালশি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারীরা রাজনীতি, নির্বাচন, খেলাধুলা, অর্থনীতি ও অন্যান্য বাস্তব ঘটনার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে চুক্তি লেনদেন করতে পারেন। এ ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘প্রেডিকশন মার্কেট’ বা ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বাজার।
লুয়ানার কাছে বিলিয়নিয়ার পরিচয় এখনো অনেকটা অবিশ্বাস্য। বন্ধুদের সঙ্গে ভালো খাবার খাওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভ্যাটিকান সিটিতে বড়দিনের প্রার্থনায় অংশ নেওয়ার মতো কিছু অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে বিশেষ। তবে দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপনের চেয়ে কালশিকে আরও বড় করে তোলাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
ব্যক্তিগত সম্পদ কিংবা প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্যকে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখেন না তিনি। বরং নিজের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান কতটা এগোচ্ছে, সেটিকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
অল্প সময়ে কয়েক গুণ বেড়েছে কালশির মূল্য
লুয়ানার সম্পদের বড় অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁর প্রতিষ্ঠান কালশির দ্রুত উত্থান। ২০২৫ সালের জুনে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। একই বছরের ডিসেম্বরে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহের পর কালশির মূল্যায়ন বেড়ে দাঁড়ায় ১১ বিলিয়ন ডলারে।
এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে আরও এক বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে কালশির মূল্যায়ন দ্বিগুণ হয়।
এখানেই শেষ নয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আরও এক বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করছিল কালশি। সেই তহবিল সংগ্রহ সম্পন্ন হলে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য মূল্যায়ন ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে তখনো এই নতুন বিনিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কালশির ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগও বেড়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বাজারে ব্যবহারকারীদের আগ্রহ এবং এই খাতের আর্থিক সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
ব্যবসার সাফল্যের পাশাপাশি আইনি চ্যালেঞ্জ
দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্যেই আইনি বিরোধের মুখে পড়েছে কালশি। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠানটির খেলাধুলাসংক্রান্ত চুক্তিগুলোকে জুয়াসদৃশ কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
তবে কালশির অবস্থান ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি প্রচলিত স্পোর্টসবুক নয়; বরং ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে পরিচালিত একটি আর্থিক এক্সচেঞ্জ। লুয়ানার মতে, তাদের ব্যবসার ধরন প্রচলিত ক্রীড়া বাজির প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। প্রেডিকশন মার্কেটের মাধ্যমে মানুষ বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে নিজেদের ধারণাকে আর্থিক চুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
কালশির প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা তারেক মনসুরও জানিয়েছেন, এই আইনি বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর কার্যক্রমের আইনগত অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্পদের চেয়ে কাজেই বেশি মনোযোগ
৩০ বছর বয়সে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও লুয়ানা লোপেস লারার দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কাজ। দিনের বড় একটি সময় তিনি কালশির পেছনে ব্যয় করেন। ব্যক্তিগত বিলাসিতার প্রতি আগ্রহ সীমিত রেখে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যালে নৃত্যের প্রশিক্ষণ থেকে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা লুয়ানার এই যাত্রা দেখাচ্ছে, অল্প বয়সে বড় আর্থিক সাফল্য অর্জনের পরও কেউ নিজের কাজের প্রতি একই রকম নিবেদিত থাকতে পারেন। তাঁর কাছে সম্পদের অঙ্কের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিজের হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানকে আরও এগিয়ে নেওয়া।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!