ওজন কমানোর ওষুধ: উপকার নাকি ঝুঁকি? জানুন সত্যটা
ওজন কমাতে বর্তমানে অনেকেই ওষুধের সহায়তা নিচ্ছেন। বাজারে মুখে খাওয়ার ট্যাবলেট থেকে শুরু করে ইনজেকশন—বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি–ওবেসিটি ওষুধ পাওয়া যায়। তবে যেভাবেই নেওয়া হোক না কেন, এসব ওষুধের যেমন উপকার আছে, তেমনি রয়েছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। সঠিক জ্ঞান ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর ওষুধ গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কীভাবে ওজন কমায় এসব ওষুধ
স্থূলতা নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ শরীরের ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় কাজ করে।
মুখে খাওয়ার ওষুধ যেমন অরলিস্ট্যাট খাবারের চর্বি শোষণ কমিয়ে দেয়। ফলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমা হয় না।
অন্যদিকে সিমাগ্লুটাইড, লিরাগ্লুটাইড বা টারজিপেটাইডের মতো ইনজেকশন ক্ষুধা কমায়, দ্রুত তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে এবং অন্ত্রের হরমোনের ওপর কাজ করে খাবার গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে আনে।
কারা ওজন কমানোর ওষুধ নিতে পারেন
আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, কারও বিএমআই ৩০ বা তার বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওজন কমানোর ওষুধ নেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া বিএমআই ২৭-এর বেশি এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা জয়েন্টের সমস্যার মতো রোগ থাকলেও ওষুধ শুরু করা যায়।
বাংলাদেশি ও এশীয়দের ক্ষেত্রে এই সীমা আরও কম—বিএমআই ২৫–২৭ ধরা হয়।
যাঁরা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে ছয় মাসেও কাঙ্ক্ষিত ওজন কমাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাঁরাও চিকিৎসকের পরামর্শে এই ওষুধ নিতে পারেন।
ওষুধ খেলে কী ধরনের পরিবর্তন ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়
ওষুধ সেবনে ক্ষুধা কমে যাওয়ায় খাবারের পরিমাণ হঠাৎ অনেক কমে যেতে পারে। এতে দ্রুত ওজন কমলেও পেশিক্ষয় ও পুষ্টির ঘাটতির ঝুঁকি থাকে।
ইনজেকশনজাতীয় ওষুধে শুরুতে বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে এগুলো অনেকটাই কমে আসে।
অরলিস্ট্যাটের মতো ওষুধে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খেলে পেটের অস্বস্তি, পাতলা পায়খানা বা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
ওষুধের সঙ্গে জীবনধারায় কী পরিবর্তন জরুরি
পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন:
চর্বিহীন প্রোটিন, গোটা শস্য, শাকসবজি ও ফলমূলকে অগ্রাধিকার দিন। প্রতিটি বেলায় একটি ভালো প্রোটিন উৎস রাখুন, যাতে পেশি ক্ষয় না হয়।
তেল–চর্বি নিয়ন্ত্রণ করুন:
ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে অরলিস্ট্যাট সেবনের সময়।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন:
পানিশূন্যতা কোষ্ঠকাঠিন্য ও মাথাব্যথা বাড়াতে পারে। সারা দিন পর্যাপ্ত পানি ও চিনি ছাড়া তরল পান করুন।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন:
প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা, সাইকেল বা সাঁতারের মতো কার্ডিও ব্যায়াম করুন। পাশাপাশি সপ্তাহে দুই দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করলে পেশি সংরক্ষণে সাহায্য করবে।
মানসিক যত্ন নিন:
ওষুধ ক্ষুধা কমালেও ইমোশনাল ইটিং বা মানসিক চাপ দূর করতে পারে না। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং, মেডিটেশন বা শখের কাজে সময় দিন।
পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা
চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন। নিজের ইচ্ছেমতো ডোজ কমানো বা বাড়ানো বিপজ্জনক।
নিয়মিত ওজন, পেটের মাপ, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করানো জরুরি।
ওষুধ গ্রহণের সময় সাধারণত গর্ভধারণ নিষেধ থাকে, তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকলে আগেই চিকিৎসককে জানান।
মনে রাখতে হবে, স্থূলতা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ বন্ধ করলে ওজন আবার বেড়ে যেতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, ওজন কমানোর ওষুধ কোনো যাদু নয়। ভুল বিজ্ঞাপন বা ভুয়া পণ্যের ফাঁদে না পড়ে কেবল স্বীকৃত ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাই গ্রহণ করা উচিত।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!