কৃষক উপেক্ষা করে কি টেকসই উন্নয়ন সম্ভব?
একসময় দেশে একটি কথা বহুল প্রচলিত ছিল— “কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।” সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কথাটি যেন আড়ালে চলে গেছে। আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু একটি বিষয়—তৈরি পোশাক শিল্পকে কীভাবে রক্ষা করা যায়। নিঃসন্দেহে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে, যা বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে কমবেশি হয়। পাশাপাশি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ।
কিন্তু একই সঙ্গে যদি কৃষিখাতের দিকে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যাবে—এই খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আসছে এবং এখনো জিডিপিতে প্রায় ১০ শতাংশ অবদান রাখছে। নানা সীমাবদ্ধতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার মধ্যেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের কৃষকরাই প্রধান ভরসা। ধান, শাকসবজি, মাছ, পোল্ট্রি, বনজ সম্পদসহ খাদ্যচাহিদা পূরণের প্রায় সব পণ্যই কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠী উৎপাদন করে থাকে।
তবু প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তার ক্ষেত্রে কৃষি খাতের সঙ্গে বৈষম্য স্পষ্ট। তৈরি পোশাক খাতের জন্য সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার সুদবিহীন ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যেখানে মালিকদের শুধু ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ দিলেই চলবে। পাশাপাশি রয়েছে আরও স্বল্পসুদের ঋণ সুবিধা। অন্যদিকে কৃষকদের জন্য একই অঙ্কের প্রণোদনা ঘোষণা করা হলেও সেখানে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য ঘোষিত প্রণোদনায়ও ৪ শতাংশ সুদ দিতে হয়।
প্রশ্ন উঠছে—কেন এই বৈষম্য? কেন এমন একটি খাত, যেখানে দেশের সর্বাধিক মানুষ কর্মরত, সেটি বছরের পর বছর অবহেলিত? যুগ যুগ ধরে এই ব্যবস্থার ফলেই দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা মানুষদের জীবনযাপন আর মাঠে-ঘাটে পরিশ্রম করা কৃষকের বাস্তবতা যে এক নয়, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকান বাজারের ওপর নির্ভরশীল এই খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ রপ্তানি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই শিল্পে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। হয়তো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কয়েক বছর পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে, আবার ভিন্ন চিত্রও অস্বাভাবিক নয়।
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে কয়েকটি শহরের বাইরে রয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার গ্রাম—এবং এই গ্রামগুলোর বেশিরভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সেই কৃষিকে উপেক্ষা করে শুধু শিল্পনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটা টেকসই, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
উন্নত দেশগুলো শিল্প বিপ্লবের পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটিয়েছে। কৃষিকে তারা শিল্পের সমান্তরালে রেখেই উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। এখনো ইউরোপ ও আমেরিকার খুব কম দেশই খাদ্য চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যদিও বিশ্বায়নের কারণে খাদ্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে, তবু নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা তারা ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশও খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে, কিন্তু অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না। তা না হলে কৃষি খাত থেকেও রপ্তানিতে বড় অবদান রাখা যেত।
দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। অন্যথায় উন্নয়ন সীমাবদ্ধ থাকবে কেবল কাগজে-কলমে। একদিকে অল্প কিছু মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়বে, অন্যদিকে বৃহৎ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ থাকবে।
তাই দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আবেদন—নীতিতে বৈষম্য দূর করুন, কৃষিকে যথাযথ গুরুত্ব দিন। কৃষক বাঁচলে তবেই দেশ বাঁচবে।
*তথ্যসূত্র:* বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!