পাকিস্তানের বাসমতির চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের ‘বাংলামতি’ চাল
সরু ও লম্বা দানার পাকিস্তানি বাসমতি চাল বিশ্বজুড়ে বিরিয়ানির অপরিহার্য উপাদান হিসেবে পরিচিত। আরব বিশ্বে তো এই চালের বিকল্পই নেই বলা চলে। ভারতে ভালো মানের বাসমতি উৎপন্ন হলেও সর্বোচ্চ মানের বাসমতির স্বীকৃতি এখনও পাকিস্তানের দখলেই। বাংলাদেশেও বাসমতি চাল পাওয়া যায়, তবে কেজিপ্রতি ২০০–২৫০ টাকার উচ্চমূল্যের কারণে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
কিন্তু এই বাস্তবতা বদলে দিতে এগিয়ে আসেন দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা। বাসমতির বিকল্প হিসেবে তাঁরা উদ্ভাবন করেন ব্রি-৫০ জাতের ধান, যা এখন পরিচিত ‘বাংলামতি’ নামে—বাসমতির বাংলা সংস্করণ।
দামে কম, গুণে এগিয়ে
বর্তমানে দেশের বাজারে বাংলামতি চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মাত্র ৫৭–৬০ টাকায়, যেখানে পাকিস্তানি বাসমতির দাম প্রায় ২৩০ টাকা। শুধু দামেই নয়, গুণগত দিক থেকেও বাংলামতি অনেক ক্ষেত্রে বাসমতির চেয়েও এগিয়ে। এই ধানের চাল রান্না করলে পোলাও বা বিরিয়ানির জন্য আদর্শ সুগন্ধ পাওয়া যায়। ভাত আঠালো হয় না, দানাও থাকে লম্বা ও সরু।
উৎপাদনে বিপ্লব
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ২০০৯ সালে যশোরে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলামতি চাষে সফল হয়। ২০১০ সালের বোরো মৌসুমে এর প্রথম বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। প্রথম বছর খুলনা অঞ্চলের হাতে গোনা কয়েকজন কৃষক এই ধান চাষ করে অভাবনীয় ফলন পান।
যেখানে পাকিস্তান ও ভারতে হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদন গড়ে ৩–৩.৫ টন, সেখানে বাংলামতির ফলন ৬ টনেরও বেশি। একরপ্রতি ফলন দাঁড়ায় ৭০–৮০ মণ, যা জনপ্রিয় ব্রি-২৮ জাতের তুলনায়ও বেশি।
বোরো মৌসুমে সুগন্ধি ধানের নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশে প্রচলিত সুগন্ধি ধান—কালজিরা, চিনিকানাই, দুলাভোগ—সবই আমন মৌসুমনির্ভর। বোরো মৌসুমে সুগন্ধি ধানের বড় অভাব ছিল। বাংলামতি সেই শূন্যতা পূরণ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রক্রিয়াজাতকরণে কিছু চ্যালেঞ্জ
বাংলামতির দানা লম্বা ও সরু হওয়ায় সাধারণ রাইস মিলে মিলিং করলে চাল ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এজন্য রাবার রোল হলারযুক্ত অটো রাইস মিলে এটি প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। বর্তমানে কুষ্টিয়ায় এই সুবিধা সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে।
রপ্তানির সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত
বিশ্ববাজারে বাসমতি চালের বিশাল চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। বাংলামতির দাম বাসমতির এক-চতুর্থাংশ হলেও গুণগত মান ও সুগন্ধে এটি প্রতিযোগিতামূলক। সঠিক বিপণন ও পরিচিতি পেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলামতি বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এই লক্ষ্যেই কূটনৈতিক উপহার হিসেবে আরব আমিরাতে বাংলামতি চাল পাঠানো হয়েছে—যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!