হাওরে বালাইনাশক ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত
আসন্ন বোরো মৌসুমে হাওর অধ্যুষিত সাতটি জেলায় কৃষি খাতে বালাইনাশকের বিক্রি ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। হাওরাঞ্চলের মৎস্যসম্পদ, গবাদি পশু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ানো হবে।
হাওরাঞ্চলে কৃষিতে বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সীমিতকরণে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় কমিটির দ্বিতীয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল রোববার সকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
সভায় ফরিদা আখতার বলেন, বর্ষা শেষে হাওরের পানি নেমে গেলে রবিশস্য, বিশেষ করে বোরো ধান চাষ শুরু হয়। অধিক ফলনের আশায় অনেক কৃষক অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালাইনাশক ব্যবহার করেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মাছ, গবাদি পশু ও হাওরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর। এ পরিস্থিতিতে বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও বলেন, হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে একক কোনো মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন জানান, কার্বোফুরানসহ কয়েকটি ক্ষতিকর বালাইনাশক ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব বালাইনাশকের বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে প্রতিরোধের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন এবং রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে জৈব ও বিকল্প ব্যবস্থাপনার আহ্বান জানান।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের মতে, বালাইনাশক ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিমালা চূড়ান্ত হলে মাঠপর্যায়ে এর অপব্যবহার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৩৩৫টি জেনেরিক নামের প্রায় ৮ হাজার ১০০টি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের বালাইনাশক রয়েছে, যা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে অনেক কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বালাইনাশক ব্যবহার করেন। এ সমস্যা কমাতে বালাইনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে ‘প্রেসক্রিপশন পদ্ধতি’ চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের জানান, বালাইনাশকের বিষাক্ততার মাত্রা পরীক্ষার জন্য এনআইবি, বিসিএসআইআর ও বারির ল্যাবরেটরি ব্যবহারে সবাই একমত হয়েছেন। তবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—বালাইনাশকের বোতল ও প্যাকেটে সহজ ও স্পষ্ট বাংলায় ব্যবহারবিধি সংযুক্ত করা, হাওর অধ্যুষিত জেলাগুলোতে কৃষকদের নিরাপদ ও সঠিক বালাইনাশক ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং খাদ্য ও পশুখাদ্যে বালাইনাশকের টক্সিসিটি পরীক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে জৈব বালাইনাশক, আইপিএম (ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট) ও জিএপি (গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস) কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হাওর অঞ্চলে বালাইনাশক নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!