Dark Mode
Image
  • Tuesday, 19 May 2026
গরমে ঠাকুরবাড়ির পাতে কী থাকত?

গরমে ঠাকুরবাড়ির পাতে কী থাকত?

গ্রীষ্মের দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে খাবারের আয়োজন ছিল ঋতুভিত্তিক, পরিমিত এবং স্বাস্থ্যসচেতন। বাহারি পদ থাকলেও খাবারের মূল দর্শন ছিল শরীরকে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং সহজপাচ্য খাবারের মাধ্যমে স্বস্তি বজায় রাখা। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের রান্নায় যেমন ছিল বাঙালি ঐতিহ্যের ছাপ, তেমনি মাঝেমধ্যে দেখা মিলত পাশ্চাত্য খাবারেরও।

সকালের জলখাবারে ভারী খাবারের বদলে থাকত হালকা ও শীতল আয়োজন। ঠান্ডা বা হালকা গরম দুধের সঙ্গে মুড়ি, কখনো দুধ-ভাত, আবার মৌসুমি ফল যেমন পাকা আম, কলা বা শসা পরিবেশন করা হতো। কোনো কোনো দিন অ্যাসপারাগাস স্যান্ডউইচ কিংবা অ্যাসপারাগাস স্যুপের মতো বিদেশি খাবারও থাকত সকালের তালিকায়। দিনের শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল শরীরকে সতেজ রাখা, অতিরিক্ত ভারী খাবারে ক্লান্ত করা নয়।

মধ্যাহ্নভোজে ফুটে উঠত ঠাকুরবাড়ির সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি। খাবার শুরু হতো তেতো পদ দিয়ে—সুক্তো, করলা ভাজা বা নিমপাতার নানা পদ ছিল গরমকালের বিশেষ আকর্ষণ। এরপর সাদা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হতো পাতলা ডাল বা কাঁচা আমের ডাল। কাঁচা আম দিয়ে তৈরি হতো শামি কাবাব, স্যালাড, মাটন কারি কিংবা আম পোড়ার শরবত। পাকা আম দিয়েও থাকত নানা রকম পদ, যেমন আম ভাতে বা আমের পুডিং।

গরমের উপযোগী সবজি যেমন লাউ, ঝিঙে, পটোল বা শসা দিয়ে তৈরি হতো হালকা ও কম মসলার রান্না। পটোলের করমচি, পটোল পোড়া, শসার অম্বল, লাউয়ের পুডিং কিংবা এঁচোড়ের হিঙ্গির মতো পদ ঠাকুরবাড়ির রান্নাঘরে ছিল বেশ পরিচিত। রান্নাগুলোতে তেল-মসলার ব্যবহার ছিল সীমিত, স্বাদে ছিল মৃদুতা ও পরিমিতি।

সবজির পাশাপাশি মাছ ও মাংসের পদও থাকত, তবে সেগুলোও হতো সহজপাচ্যভাবে রান্না করা। কাঁচা আম দিয়ে রুই মাছের স্টু, শিং মাছের স্টু, মাগুর মাছের হিঙ্গি কিংবা হালকা মসলায় রান্না করা পাঁঠার মাংস গরমের দিনের উপযোগী করেই পরিবেশন করা হতো।

খাবারের শেষ পর্বে থাকত চাটনি, অম্বল ও দই। কখনো ঠাকুরবাড়ির হেঁশেলে তৈরি হালকা মিষ্টির সন্দেশও পরিবেশন করা হতো। বিকেলের জলখাবারে থাকত দইয়ের ঘোল, বেলের শরবত, লেবুর শরবত কিংবা মৌসুমি ফলের পানীয়। সঙ্গে মুড়ি, নারকেল কুচি ও কাঁচা মরিচের সরল আয়োজনও ছিল বেশ জনপ্রিয়।

রাতের খাবারে কখনো কখনো ইউরোপীয় প্রভাবও দেখা যেত। পাতলা স্টু, পুডিং, পায়েস কিংবা দুধের তৈরি বিভিন্ন মিষ্টান্ন ঠাকুরবাড়ির খাদ্যতালিকাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলত।

চিত্রা দেবের ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ এবং প্রজ্ঞা সুন্দরী দেবীর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বই থেকে জানা যায়, ঠাকুরবাড়ির গ্রীষ্মকালীন খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্য, স্বাদের সংযম এবং পুষ্টির ভারসাম্য।

 

Comment / Reply From