ধানখেতেও এআই, বদলে যাচ্ছে চীনের কৃষি
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে চীনের কৃষি
ফল ধরার পর থেকে পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত গাছটির প্রতিটি ধাপই দেখতে পারেন একজন গ্রাহক। ফল পেকে গেলে তা গাছ থেকে প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করে ডাকযোগে পৌঁছে দেওয়া হয় সরাসরি গ্রাহকের বাড়িতে। ফলে শহরে বসে থাকা একজন মানুষও একটি নির্দিষ্ট গাছের সঙ্গে গড়ে তুলতে পারেন এক ধরনের আবেগীয় সম্পর্ক। একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন, নিজের কেনা কৃষিপণ্যটি ঠিক কোথা থেকে এসেছে।
এই ব্যবস্থায় লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরাও। শুধু কৃষিপণ্য বিক্রির ওপর নির্ভর না করে কৃষি-পর্যটন ও ডিজিটাল সেবা থেকেও তারা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন গতি।
কৃষিতে প্রযুক্তির আরেক দৃষ্টান্ত চিয়াননিং
চীনের চিয়াননিং কাউন্টিতে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্ময়কর। অঞ্চলটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন কেন্দ্র। চীনে জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহৃত ধানের বীজের প্রায় ১০ শতাংশ চিয়াননিং কাউন্টি থেকে সরবরাহ করা হয়।
এখানকার কৃষিক্ষেত্রে যেমন রয়েছে কাদামাটির সঙ্গে কৃষকের নিবিড় সম্পর্ক, তেমনি রয়েছে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার। কৃষকের হাতে থাকা মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, কৃষিকাজ পরিচালনারও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
চিয়াননিংয়ের কৃষকেরা ব্যাপকভাবে ‘লিয়াংশেংপাও’ নামের একটি বিশেষায়িত কৃষি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করেন। একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই তারা ধানের বীজের অর্ডার পরিচালনা করতে পারেন। একই সঙ্গে ড্রোন, ট্রাক্টরের মতো আধুনিক কৃষিযন্ত্র বুকিং এবং আবহাওয়া ও মাটির আর্দ্রতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্যও পাওয়া যায় এই অ্যাপ থেকে।
ডিজিটাল নেটওয়ার্কে হাজারো কৃষক
চিয়াননিংয়ে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার ‘মু’ জমি বীজ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশি হিসাবে এই জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৭৩৩ হেক্টরেরও বেশি। এ বিশাল কৃষি এলাকার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ২৪ হাজারের বেশি কৃষক।
ডিজিটাল প্রযুক্তির এই নেটওয়ার্ক কৃষকদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে। প্রয়োজনীয় কৃষিযন্ত্র পাওয়া থেকে শুরু করে আবহাওয়া ও মাটির পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য—সবকিছু হাতের মুঠোয় থাকায় কৃষকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও বাড়ছে।
কৃষকের বিকল্প নয়, সহায়ক প্রযুক্তি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিজিটাল প্রযুক্তির কথা উঠলে সাধারণত বড় শহর, আধুনিক অফিস কিংবা শিল্পকারখানার চিত্রই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু চিয়াননিং দেখিয়েছে, প্রযুক্তির সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের কাছেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
এখানে প্রযুক্তি কৃষককে তার কাজ থেকে সরিয়ে দেয়নি। বরং কৃষকের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করে তার কাজকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করেছে। কৃষি হয়েছে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর, কিন্তু কৃষকের সঙ্গে জমির সম্পর্ক হারিয়ে যায়নি।
সবুজ পাহাড়ে ঘেরা চিয়াননিংয়ের সাফল্যের বড় দিকটি সম্ভবত এখানেই—আধুনিকতা এসেছে, কিন্তু কৃষির শিকড়কে উপড়ে ফেলেনি। যন্ত্র ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, কিন্তু কৃষকের নিজস্ব পরিচয় ও সামাজিক বন্ধনও টিকে আছে।
কাদামাটির মাঠে প্রযুক্তির নতুন গল্প
চিয়াননিং থেকে ফেরার সময় গাড়ি যত সামনে এগিয়েছে, ততই পেছনে পড়ে থাকা ধানখেতের দৃশ্য মনে ভেসে উঠেছে। কাদা-পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করা কৃষকের প্রাণখোলা হাসি, হাতে তুলে দেওয়া ধানের গুচ্ছ আর মাঠজুড়ে গ্রামবাসীদের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞ—সবকিছু যেন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির মধ্যেও মানুষের সঙ্গে মাটির গভীর সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।
চিয়াননিংয়ের গল্প তাই শুধু আধুনিক কৃষির গল্প নয়। এটি এমন এক কৃষিব্যবস্থার উদাহরণ, যেখানে প্রযুক্তি, প্রকৃতি ও মানুষের শ্রম পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!