Dark Mode
Image
  • Wednesday, 10 June 2026
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন

স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন

হঠাৎ করে কারও মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে আসা কিংবা শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া—এগুলো সাধারণ কোনো শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি এবং মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

স্ট্রোক কী?

মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা রক্তনালী ফেটে রক্তক্ষরণ হলে মস্তিষ্কের কোষ পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। ফলে আক্রান্ত অংশের কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই স্ট্রোক বলা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্ট্রোককে অন্যতম জরুরি মেডিকেল ইমার্জেন্সি হিসেবে ধরা হয়।

স্ট্রোকের প্রধান দুই ধরন

১. ইস্কেমিক স্ট্রোক

মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে এই ধরনের স্ট্রোক হয়। মোট স্ট্রোকের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশই এই শ্রেণির।

২. হেমোরেজিক স্ট্রোক

মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালী ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হলে তাকে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলা হয়। তুলনামূলক কম হলেও এটি অনেক বেশি জটিল ও প্রাণঘাতী হতে পারে।

কেন হয় স্ট্রোক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সাধারণ কারণ স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়—

  • অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস
  • ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার
  • রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল
  • স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
  • হৃদস্পন্দনের অনিয়ম (অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন)
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা
  • পরিবারে স্ট্রোক বা হৃদরোগের ইতিহাস

স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ কী?

স্ট্রোক দ্রুত শনাক্ত করতে চিকিৎসকেরা ‘FAST’ পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।

F (Face): মুখের এক পাশ হঠাৎ বেঁকে যাওয়া বা ঝুলে পড়া।

A (Arm): দুই হাত সমানভাবে তুলতে না পারা অথবা এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া।

S (Speech): কথা জড়িয়ে যাওয়া বা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে অসুবিধা হওয়া।

T (Time): এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

এ ছাড়া হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, হাঁটতে সমস্যা, শরীরের ভারসাম্য হারানো কিংবা ঝাপসা দেখা—এসবও স্ট্রোকের সতর্ক সংকেত হতে পারে।

কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?

স্ট্রোক শনাক্ত করতে সাধারণত কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়—

  • সিটি (CT) স্ক্যান
  • এমআরআই (MRI)
  • প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য কার্ডিয়াক মূল্যায়ন

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোকের ধরন ও ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।

চিকিৎসা কী?

ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে রক্ত জমাট গলানোর বিশেষ ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা থ্রম্বেক্টমির প্রয়োজন হয়।

অন্যদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোকে রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী মেরামতের জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।

স্ট্রোকের পর রোগীর পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে—

  • ফিজিওথেরাপি
  • স্পিচ থেরাপি
  • অকুপেশনাল থেরাপি

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত ফিজিওথেরাপি শুরু করলে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ে।

স্ট্রোক প্রতিরোধে যা করবেন

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি।

  • নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন।
  • স্বাস্থ্যকর ও কম লবণযুক্ত খাবার খান।
  • ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করুন।
  • প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করুন।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়মিত সেবন করুন।
  • মানসিক চাপ কমাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম নিশ্চিত করুন।

স্ট্রোক আর হার্ট অ্যাটাক এক নয়

অনেকেই স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাককে একই রোগ মনে করেন। তবে স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহের সমস্যা, আর হার্ট অ্যাটাক হয় হৃদ্‌পিণ্ডে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলে।

চিকিৎসকদের মতে, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারলে জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি স্থায়ী শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

Comment / Reply From