Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 January 2026

পুরনো ঢাকার বাকরখানি: স্বাদের ঐতিহ্য আর প্রেমের কিংবদন্তি

পুরনো ঢাকার বাকরখানি: স্বাদের ঐতিহ্য আর প্রেমের কিংবদন্তি

স্বাদ, ঘ্রাণ ও গুণগত মানের কারণে পুরনো ঢাকার বাকরখানি যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। অনেকের কাছে এটি ‘সুকা রুটি’ নামেও পরিচিত। একসময় ভোররাত থেকেই পুরনো ঢাকার অলিগলিতে তন্দুরে বানানো এই রুটির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে।

যেভাবে তৈরি হয় বাকরখানি

বাকরখানি তৈরির কাজ শুরু হয় মধ্যরাত থেকেই। বাকরখানিওয়ালারা কাঠকয়লার তৈরি তন্দুর জ্বালিয়ে প্রস্তুতি নেন। সাদা ময়দা, লবণ, পানি ও তেল দিয়ে তৈরি করা হয় খামির—আগের দিনে যেখানে তেলের বদলে ঘি ব্যবহার করা হতো।

খামিরের ওপর সামান্য ময়দা ও তেল মাখিয়ে গোল গোল বল বা ‘গোল্লা’ তৈরি করা হয়। এরপর তা চ্যাপ্টা করে ছোট রুটির আকার দেওয়া হয়। কয়লার তাপে দীর্ঘক্ষণ সেঁকে রুটি যখন বাদামি রং ধারণ করে, তখন তা নামিয়ে নেওয়া হয়।

পুরনো ঢাকায় বাকরখানি সাধারণত মাংসের ঝোল, মিষ্টির সিরা কিংবা গরম চায়ে ভিজিয়ে খাওয়ার চল রয়েছে—যা স্বাদে একেবারেই অনন্য।

বাকরখানি নামকরণের পেছনের ইতিহাস

বাকরখানি শুধু একটি খাবার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক করুণ প্রেমকাহিনি। ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে দেওয়ান মুরশিদ কুলি খান পূর্ব বাংলায় আগমন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এক কিশোর—আগা বকর খান। পরবর্তীতে আগা বকর খান চট্টগ্রামের সৈন্যদলের কমান্ডার নিযুক্ত হন।

চট্টগ্রামে থাকাকালীন তিনি খানি বেগম নামে এক নাচশিল্পীর প্রেমে পড়েন। একই সময়ে কোতওয়াল জয়নুল খানের নজরও পড়ে খানি বেগমের ওপর। এই নিয়ে আগা বকর ও জয়নুলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আগা বকর জয়নুলকে হত্যা করেছেন। এই অভিযোগে মুরশিদ কুলি খান আগা বকরকে কারাগারে পাঠান।

কিন্তু বাস্তবে জয়নুল যুদ্ধে পরাজিত হয়ে খানি বেগমকে অপহরণ করে চন্দ্রদ্বীপে পালিয়ে যান। সংবাদ পেয়ে আগা বকর কারাগার ভেঙে প্রিয়াকে উদ্ধারে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি খানি বেগমের নিথর দেহ দেখতে পান—আগা বকর পৌঁছানোর আগেই জয়নুল তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় আগা বকর আজীবন শোকে ভেঙে পড়েন এবং কখনোই খানি বেগমকে ভুলতে পারেননি। তাদের এই ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনিকে কেন্দ্র করেই পুরনো ঢাকার এই বিশেষ রুটির নামকরণ হয় বাকরখানি—আগা বকর ও খানি বেগমের নামের স্মরণে।

আজও বাকরখানি পুরনো ঢাকার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও আবেগের এক অনন্য প্রতীক হয়ে টিকে আছে।

Comment / Reply From